Mysterious Unknown Serial Killer

অজ্ঞাতনামা খুনি

এখন পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণখানেই দেখা গেছে এই খুনিকে। ফর্সা, প্রায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা, সুদর্শন এই যুবককে দেখলে ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ হবে না সে একজন ক্রমিক খুনি। শিক্ষিত ও মার্জিত বাচনভঙ্গির এই যুবক শিকার হিসেবে বেছে নেয় মধ্যবয়সী ধনাঢ্য নারীদের। বাসা ভাড়া নেবার অজুহাতে সে তার শিকারের বাড়িতে আসে। গৃহকর্ত্রী তাকে ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে গেলে সে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তাদের হত্যা করে। তবে আশেপাশে লোকজন থাকলে সে কিছুই না করে সরে আসে। এখন পর্যন্ত তিনজনকে খুন ও দুজনকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করেছে সে। রুচিশীল পোশাক পরিহিত, কাঁধে ব্যাগ নেয়া এই যুবককে দেখে ঠাহর করা কঠিন যে সে খুনের মতো কাজও করতে পারে।

এই অজ্ঞাতনামা খুনি তার কাজ শুরু করে ২০১৬ সালের ২৪শে জুলাই থেকে। সেদিন দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইর এর এক বাসায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেবার উছিলায় হাজির হয় এই খুনি। গৃহকর্ত্রী শাহিদা বেগম (৫০) বাসা দেখাতে নিয়ে গেলে সে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করে। পরদিন অর্থাৎ ২৫শে জুলাই দক্ষিণখানের আশকোনা মেডিকেল রোডের ২৩৫ নং বাসার গৃহকর্ত্রী মাহিরা বেগমকে (৫০) কুপিয়ে জখম করে সে। মাহিরা বেগমের স্বামী সুলতান আহমেদ বাসায় সাবলেট ভাড়া দেবার জন্য নোটিশ টানান। বেলা সাড়ে ১১ টার সময় ঐ যুবক ৪র্থ তলায় উঠে এসে মাহিরা বেগমের সাথে ভাড়ার ব্যাপারে আলাপ করতে থাকে। এরপর ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে মাহিরা বেগমের মাথায় দুটি ও গলার পেছনে একটি কোপ দিয়ে পালিয়ে যায় এই খুনি। রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

২১শে আগস্ট পূর্ব মোল্লারটেকে তার পরবর্তী শিকার হতে যাচ্ছিলেন সুরাইয়া আক্তার (৫২)। একই পদ্ধতিতে খুন হন তেঁতুলতলা ইয়াসিন রোডের এই নারী। স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিহত এই নারী বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে পরিবারসহ থাকতেন। বাড়ীটির ৩য় তলায় ফ্ল্যাট খালি ছিল এবং সেটি দেখাতে গিয়েই এই নারী খুন হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঐ ফ্ল্যাটেই তার রক্তাক্ত নিথর দেহ পাওয়া যায়।

অতঃপর ঐ মাসের ৩১ তারিখ সে উত্তরার দক্ষিণ আজমপুর এলাকায় খুঁজে নেয় পরবর্তী শিকার। আজমপুরের মুন্সি মার্কেট এলাকার ৮১/৩৯ নম্বর বাড়ির কাজী মজিবুর রহমানের স্ত্রী জেবুন্নেসা চৌধুরীকে (৫৬) কুপিয়ে আহত করে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আঘাতের জন্য তার দুটো চোখই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রেও বাড়ি ভাড়া নেবার অজুহাতের আশ্রয় নেয় এই খুনি। চতুর্থ তলায় ফ্ল্যাট দেখাতে গেলে তার উপর আক্রমণ হয় বলে জানা গেছে। আহতের মতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে কোপানো শুরু হয়। তার দেয়া বর্ণনার সাথে অন্যদের দেয়া খুনির চেহারার বর্ণনা হুবহু মিলে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি স্কুল ব্যাগ এবং লোহার চাপাতি জব্দ করে পুলিশ।

এই ধূর্ত খুনির এখন পর্যন্ত সর্বশেষ শিকার দক্ষিণখানের আশকোনার গাওয়াইরের দক্ষিণ পাড়ার ৭১৫ নম্বর বাড়ির ওয়াহিদা আক্তার সীমা (৪৪)। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নীল-কালো শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত এক যুবক বাড়ির নিচে আসে। যুবকের হাতে ব্যাগ ছিল। নিহতের মেয়ে শারমিন আক্তার (২২) ঐ ব্যক্তির কাছে আসার কারণ জানতে চাইলে সে বাসা ভাড়ার ব্যাপারে কথা বলবে বলে জানায়। ব্যাচেলর ভাড়া দেয়া হয় না বলার পর পরিবার নিয়ে থাকবে বলে জানায় ঐ ব্যক্তি। তিনতলা থেকে চাবি নিচে ফেলে ঐ যুবককে কাঁচিগেট খুলে উপরে আসতে বলেন তিনি। এরপর ওয়াহিদা তাকে ষষ্ঠতলায় ফ্ল্যাট দেখানোর জন্য নিয়ে যান। এর ১৫ মিনিট পর শারমিন আক্তার সেখানে গেলে রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝেতে মায়ের মৃতদেহ দেখতে পান।

খুনির অন্য শিকারের মতো এখানেও গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। মেঝেতে পানি পাওয়া যাওয়ায় ধারণা করা হয় খুনের পর নিজের শরীর থেকে রক্ত মুছতে ও জুতোতে রক্তের দাগ লাগা ও তার ছাপ রুখতে সে পানি ব্যবহার করে। এই ঘটনার আগেরদিনও পাশের একটি বাড়িতে গিয়েছিল এই খুনি। কিন্তু তাকে যে ফ্ল্যাটটি দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয় সেটির আগের ভাড়াটিয়া তখনও না চলে যাওয়ায় সে তার উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যর্থ হয় এবং ফ্ল্যাট না দেখেই সেখান থেকে চলে যায়। যাবার আগে বলে যায়- সে যে কাজের জন্য এসেছিল তার লাভ হয়নি। কি কাজ জিজ্ঞাসা করা হলে সে “কোনো কাজ হলো না” বলে চলে যায়। পার্শ্ববর্তী বিল্ডিঙয়ের সিসিটিভি ফুটেজে তার গমনদৃশ্য দেখা যায়, যদিও তাতে চেহারা অস্পষ্ট।

সিসিটিভি ফুটেজে ধারণকৃত খুনির অস্পষ্ট প্রতিকৃতি

র‍্যাব-এর আঁকিয়েদের দিয়ে তার একটি চিত্র প্রস্তুত করা হলেও সে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। অত্যন্ত ধূর্ত এই খুনি বাসা ভাড়ার অজুহাতে নানা বাসায় হাজির হলেও কখনোই ভাড়ার জন্য দেয়া ফোন নম্বরে ফোন করে না। সে চাপাতি চালানোতে বিশেষভাবে দক্ষ। মাঝবয়সী সম্পদশালী নারীদের উপর তার কোনো কারণে ক্ষোভ রয়েছে। এসব ঘটনার কারণে দরজায় বেল বাজলেই আঁতকে উঠছে দক্ষিণখানবাসী।